বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ২৪ ঘণ্টার সম্প্রচার উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের মন ও মননের ইতিবাচক পরিবর্তনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্র বস্তুনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, ‘বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ভাষা, শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-কৃষ্টি বিকাশের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০২০ সালের ২৪ জানুয়ারি এই কেন্দ্রের সমপ্রচার ১২ ঘণ্টায় এবং এ বছরের ১০ জানুয়ারি ১৮ ঘণ্টায় উন্নীত করা হয়। রজতজয়ন্তী উপলক্ষে এবার ২৪ ঘণ্টার সমপ্রচার শুরু হলো। সমাজ সংস্কারে টেলিভিশনসহ গণমাধ্যম বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আমি আশা করব, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও অনুষ্ঠান প্রচারের মধ্য দিয়ে টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্র মানুষের মন ও মননের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।’ গতকাল (রোববার) বিকেলে নগরীর পাহাড়তলীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের রজতজয়ন্তী উৎসব এবং ২৪ ঘণ্টার সম্প্রচার কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে ভিডিওবার্তা প্রেরণ করে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।
ভিডিওবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান সরকার অবাধ তথ্যপ্রবাহে বিশ্বাস করে উল্লেখ করে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি দেশে এখন ৪৫টি বেসরকারি টেলিভিশন, ২৮টি এফ এম ও ৩২টি কমিউনিটি রেডিও’র সমপ্রচার চলমান আছে। এর বেশিরভাগই আমাদের সরকার অনুমোদন দিয়েছে। আমরা সমপ্রচার নীতিমালা ও অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা করেছি। বর্তমানে দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেল বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমপ্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’ সরকার অবাধ তথ্যপ্রবাহে বিশ্বাসী বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রকে প্রধানমন্ত্রীর সেই যাত্রার সঙ্গী হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তথ্য সচিব মোহাম্মদ মকবুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সমপ্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক সোহরাব হাসান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মহাব্যবস্থাপক নিতাই কুমার ভট্টাচার্য।
তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র কোনো আঞ্চলিক কেন্দ্র নয়। এটা নিয়ে অনেকেই ভুল করেন। এটি টেরিস্ট্রিয়াল চ্যানেল, যার মাধ্যমে ক্যাবল নেটওয়ার্ক ছাড়া সারাদেশের ৭৫ ভাগ অংশে দেখা যায়। আর ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারাদেশেই সমপ্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের অনুষ্ঠান দেখা যায়।’

তিনি বলেন, শিগগিরই আরও ছয়টি বিভাগে বিটিভির চ্যানেল হবে। এ হিসাবে বিটিভির ১০টি চ্যানেল হবে। এরই মধ্যে একনেকে এর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী এক মাসের মধ্যে এ কাজ শুরু হবে। আমি আশা করব, আজকের এই ২৪ ঘণ্টা সমপ্রচারের উদ্বোধনের মাধ্যমে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র গণমানুষের দর্পণ হিসেবে কাজ করবে।
তিনি টেলিভিশন সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক নিয়ম কানুন অনুসরণ করার আহ্বনা জানিয়ে বলেন, কোনো ভবনে আগুন লাগলে তা লাইভ করে সারাদেশের মানুষের মনে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। কোনো গর্তে কেউ পড়লে তা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত লাইভ করা হয়। হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীকে লাইভে দেখানো হয়। অথচ ইংল্যান্ডের মতো দেশে এসব করা হয় না।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘বিটিভির চট্টগ্রাম কেন্দ্র উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের বহুমুখী প্রতিভার চর্চা বিকাশ এবং উপার্জনের পথটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে। আমাদের তথ্যমন্ত্রী সম্প্রচার নীতিমালা বাস্তবায়নে অত্যন্ত সাহসী একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে মন্তব্য করে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, এই নীতিমালা প্রণয়নকালে আমিও জড়িত ছিলাম। আমরা নীতিমালা প্রণয়ন করলেও তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমাদের তথ্যমন্ত্রী তা কার্যকর করার সাহস দেখিয়েছেন। এতে আমাদের দেশের শিল্পী কলাকুশলীসহ সকলেই উপকৃত হয়েছেন। একটি খাত ডেভলপ করেছে। কর্মসংস্থান এবং মন ও মননের বিকাশের ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তথ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, কারণ আপনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাহসিকতার সঙ্গে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমরা এই টেলিভিশনে চট্টগ্রামের বৈচিত্র্য, কঙবাজারের বৈচিত্র্য, তিন পার্বত্য জেলার বৈচিত্র্য দেখতে চাই। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যের কথা আমরা গৌরবের সঙ্গে তুলে ধরতে চাই। আমাদের এখানে আবহমান যে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি, বিভিন্ন বৈচিত্র্য নিয়েও মানুষের মধ্যে যে সহাবস্থান, সেগুলো বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা হোক। অসামপ্রদায়িক, প্রগতিশীল, সাম্যের বাংলাদেশের কথা প্রচার করা হোক।
সিটি মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্রকে চট্টগ্রামের অনেক বড় সম্পদ বলে উল্লেখ করেন। তিনি এই কেন্দ্রের অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের মাধ্যমে চট্টগ্রামবাসীকে বড় উপহার দেয়া হলো বলেও মন্তব্য করেন।